শাহ আলী তৌফিক রিপন, নিজস্ব প্রতিবেদক;
বাংলাদেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ নির্ভর করে সরকারি ক্রয় ও ঠিকাদারি ব্যবস্থার ওপর। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কাগজে-কলমে যতই সুন্দর হোক না কেন, বাস্তবে তার সফলতা নির্ভর করে সঠিক ও যোগ্য ঠিকাদারের হাতে কাজ পৌঁছানো এবং নির্ধারিত সময়ে মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে একটি বড় সংকটের নাম হয়ে উঠেছে টেন্ডারবাজি।
টেন্ডারবাজি মানে শুধু কারচুপি নয়, এর মাধ্যমে জনগণের অর্থ লুটপাট হয়, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যাহত হয়, আর বছরের পর বছর সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। যারা দরপত্রে অংশগ্রহণই করেন না, তারাই রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা কমিশন দিয়ে কাজ নিয়ে নেন। এতে প্রকৃত ও যোগ্য ঠিকাদাররা কাজের বাইরে থেকে যান।
ফলে যা হওয়ার, তাই হয়। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, অর্ধসমাপ্ত কাজ, কিংবা লোকসানের হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রকল্প ফেলে পালানো—এসব দৃশ্য নতুন নয়। মোহাম্মদপুর বেঁড়িবাধ সিটি গার্ডেন প্রকল্প তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। ১০ বছরেও কাজ শেষ হয়নি।
আগে দরপত্রে সর্বোচ্চ ১০% কম ছিল স্বাভাবিক সীমা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০%-এ। প্রথমে এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আর্থিকভাবে লাভজনক মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিই বেশি হয়। কারণ বাজারদর বাড়তে থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ মেটানো যায় না। তখন হয় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হয়, নয়তো কাজ অসমাপ্ত থাকে।
সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার এ ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে কিছু বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের আখের গোছায়। উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর ভোগান্তিতে থাকে।
প্রকৃত ঠিকাদাররা এ অবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাদের দাবি স্পষ্ট—
যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দরপত্র সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
কমিশনভিত্তিক টেন্ডারবাজদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
কাজের মানের সঙ্গে আপস করলে সেই ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে।
একটি রাস্তা ১০ বছর টিকবে ভেবে নির্মাণ হয়, কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই ভেঙে যায়। সেতু তৈরি হয়, কিন্তু দুই মৌসুমের মধ্যেই ফাটল ধরে। ভবন তৈরি হয়, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এগুলো শুধু দুর্নীতির কারণে নয়, বরং টেন্ডারবাজির সরাসরি ফলাফল।
জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হলে এখনই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার জরুরি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃত ঠিকাদাররা সামনে আসবেন, আর জনস্বার্থই হবে উন্নয়নের আসল লক্ষ্য।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে হাঁটছে। কিন্তু যদি টেন্ডারবাজি দমন করা না যায়, তবে উন্নয়নের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে না। দেশের অগ্রগতি, জনগণের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই অবকাঠামো—সবকিছুর জন্যই দরকার স্বচ্ছ, ন্যায্য ও দুর্নীতিমুক্ত টেন্ডার প্রক্রিয়া।
কারণ, উন্নয়ন মানে শুধু ইট-পাথর নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের আস্থা, সাশ্রয় ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
শাহ আলী তৌফিক রিপন
বিশেষ প্রতিনিধি
০১৭৯১৬৩৮২৪৪