ভেজাল ফিডের বিষে ধ্বংস হচ্ছে ক্ষুদ্র খামারিদের স্বপ্ন। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের স্বপ্নভূমি কেন্দুয়া আজ পরিণত হয়েছে ভেজাল ব্যবসায়ীদের স্বর্গরাজ্যে। প্রশাসনের সাময়িক অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না এই ভয়াবহ বাণিজ্য। প্রশ্ন উঠছে—আইনের দুর্বলতা কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে?
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলাজুড়ে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে ভেজাল ও অননুমোদিত ফিডের ব্যবসা। বাজারের প্রতিটি কোণে, ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড় পাইকারি বিক্রেতার তাকেও এখন ভেজাল ফিডের দাপট স্পষ্ট। ফলে ক্ষুদ্র পোলট্রি ও গবাদিপশু খামারিরা পড়ছেন ভয়াবহ ক্ষতির মুখে।
পানগাও গ্রামের খামারি রহমত উল্লাহর ঘটনাটি এখন আলোচনায়। জানা গেছে, তিনি নওপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী এমদাদের দোকান থেকে ফিড কিনেছিলেন। কিন্তু সেই ফিড খাওয়ানোর পর তার শত শত মুরগি মারা যায়। পরে স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি ‘আপোষে’ মীমাংসা হয়। থানা পর্যন্ত অভিযোগ না পৌঁছানোর সুযোগে ব্যবসায়ীরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রশাসনের মাঝে মাঝে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিলেও এর প্রভাব থাকে খুবই স্বল্পমেয়াদি। কারণ একটাই—মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানা দিয়েই যদি লাখ টাকার মুনাফা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অনৈতিক ব্যবসায়ীরা কেনই বা থামবে?
এই অবস্থায় প্রশাসনের নজরদারি শিথিলতা ও দুর্বল আইন প্রয়োগ যেন ভেজাল ব্যবসায়ীদের উৎসাহ জোগাচ্ছে।
এক সময় কেন্দুয়ার ক্ষুদ্র পোলট্রি ও গবাদিপশু খামারিরা নিজেদের পরিশ্রমে আত্মনির্ভর জীবনের স্বপ্ন দেখতেন। আজ সেই স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে ভেজাল ফিডের কারণে। এসব ফিডে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ না থাকায় প্রাণীর বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, রোগবালাই বাড়ছে, এবং অনেকে মারাও যাচ্ছে। ফলে দিনদিন খামারিদের আর্থিক ক্ষতি ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।
ভেজাল ফিড ব্যবসার এই প্রসার কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—এটা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি। যখন একজন ব্যবসায়ী জানে—এক হাজার টাকার জরিমানা দিয়েই লাখ টাকার লাভ সুরক্ষিত রাখা যায়, তখন তার কাছে আইন হাস্যকর হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হচ্ছে—এই দুর্বল আইন ও প্রশাসনিক শৈথিল্য কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে? সৎ খামারির, না অসাধু ব্যবসায়ীর?
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং ফিড নমুনা পরীক্ষা। প্রতিটি ফিড দোকানকে মাননিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় কৃষি ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, যাতে অননুমোদিত পণ্য বাজারজাত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়।
এছাড়া সাধারণ খামারিদেরও সচেতন হতে হবে—ফিড কেনার আগে অনুমোদন, উৎপাদক কোম্পানি এবং মেয়াদ যাচাই করা জরুরি।
তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়—সমাজে নৈতিকতার চর্চাও ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, ভেজাল ব্যবসা শুধু অন্যের ক্ষতি নয়, নিজেরও অকল্যাণ ডেকে আনে। একজন সৎ ব্যবসায়ী, একজন সচেতন প্রশাসক ও একজন দায়িত্বশীল নাগরিক—এই ত্রিমাত্রিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্ভব ভেজালমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা।
কেন্দুয়ার মাটিতে ভেজাল ব্যবসার বিষবাষ্প থামাতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে এই আগুন একদিন আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়বে—ক্ষতি হবে শুধু খামারির নয়, আমাদের সকলের ভবিষ্যতের।
⸻
২০ অক্টোবর ২০২৫
০১৭৯১৬৩৮২৪৪
শাহ আলী তৌফিক রিপন
নিজস্ব প্রতিবেদক