
রেজুয়ান হাসান, নিজস্ব প্রতিবেদক;
শোবিজ জগতের আলো ঝলমলে মুখগুলোর পেছনে যে কত অন্ধকার জমে থাকে, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। পর্দায় যারা হাসে, তারা সব সময় সুখী হয় না। জনপ্রিয় টেলিভিশন অভিনেত্রী মিহি আহসান সেই তালিকায় নতুন নাম নয়, তবে তার জীবনগল্পের এক অজানা অধ্যায় সামনে এলো ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর বিকাল ৩টার দিকে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সাক্ষাৎকারটি তিনি দিয়েছেন জনপ্রিয় অনুষ্ঠান তারাবেলা-তে।
নিজের অনুভূতি সম্পর্কে মিহি অকপটে বলেন:
মানুষ দেখে মনে করে আমি খুব শক্ত, কিন্তু বাস্তবে আমি ভীষণ নরম। নিজেকে শক্তিশালী মনে করলেও ভেতরে আমি খুব দুর্বল। একটু কষ্ট পেলেই কেঁদে ফেলি। আমি চাই না কেউ আমার দুর্বলতা দেখুক, তাই সবসময় হাসি দিয়ে সেটি ঢেকে রাখি। এই হাসিটা অনেক সময় ভেতরের ব্যথা লুকানোর মাধ্যম হয়ে যায়।
এই কথাগুলো কেবল তার একার নয়, যেন হাজারো নারীর জীবনগল্পের প্রতিধ্বনি। এমন একটা সমাজে, যেখানে মেয়েদের সব সময় শক্ত হতে শেখানো হয়, সেখানে দুর্বলতা লুকিয়ে রাখাও এক ধরনের সংগ্রাম। কিন্তু যে সংগ্রাম চোখে পড়ে না, তাই সবচেয়ে গভীর। আরও গভীরে গেলে পাওয়া যায় তার বিয়ের প্রসঙ্গ।
মিহি বলেন:
আমি বিয়ের পর জানতে পারি, আমার প্রাক্তন স্বামী ইতিমধ্যে আরেকজনকে বিয়ে করেছে। তখন মনে হয়েছিল পৃথিবী থেমে গেছে। আমি কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ সরে যাই। কোনো নাটক করি না, কোনো সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিই না। শুধু নিজেকে সামলে নিতে চেয়েছিলাম। মানুষ বুঝতে পারে না, সে সময় কতটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। তবে জানতাম, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতেই থাকতে হবে।
এই চুপচাপ সরে যাওয়া অনেকের চোখে দুর্বলতা মনে হলেও, বাস্তবিক অর্থে এটি ছিল এক ধরনের আত্মমর্যাদার ঘোষণা। তিনি নাটক করেননি। না বাস্তবে, না ভার্চুয়াল জগতে। বরং চুপচাপ নিজের ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে আবার দাঁড়ানোর পথ বেছে নিয়েছেন।
সবচেয়ে আলোচিত অংশ আসে যখন তিনি বলেন: হ্যাঁ, সত্যি। আমার বিয়ের কাবিন ছিল ১৮ টাকা। তখন আমি ছোট ছিলাম, কিছু বুঝিনি। এখন মনে হয়। এটাও ছিল এক ধরনের অসম্মান। ভালোবাসা থাকলে কাবিনের মূল্য টাকা দিয়ে নয়, বিশ্বাস দিয়ে নির্ধারিত হয়।
এই কথাগুলো যেন সমাজের মুখের ওপর ছুড়ে মারা এক অদৃশ্য প্রশ্নবাণ। ১৮ টাকা কাবিন এটা নিছক একটা সংখ্যা নয়, বরং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আয়না।
এত কম দামে একটা সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা করা যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে ভালোবাসার মান কি বাড়ে, নাকি সম্মানের মান কমে?
মিহির গল্প আজ ভাইরাল হওয়ার উপযুক্ত উপাদান বটে নামী অভিনেত্রী, প্রতারণা, কাবিন, কষ্ট, কান্না। কিন্তু ভাইরাল হওয়ার বাইরেও এটা এক সাহসী নারীর গল্প, যিনি ভেঙেছেন, কেঁদেছেন, কিন্তু থেমে থাকেননি।
নীরবে, সংযমে, আত্মসম্মানে নিজের পথ খুঁজে নিয়েছেন পেছনে তাকাননি।
আমার কথা:
মিহি আহসানের এই সাক্ষাৎকার কেবল একজন অভিনেত্রীর জীবনকথা নয়।
এটা এক সমাজের প্রতিচ্ছবি যেখানে সম্পর্কের ভেতরেও অসম্মান লুকিয়ে থাকে, ভালোবাসার আড়ালেও প্রতারণা বসে থাকে।
১৮ টাকার কাবিন দিয়ে শুরু হওয়া গল্পটা হয়তো মূল্যহীন ছিল কারও কাছে, কিন্তু একজন নারীর নিজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে সেটিই হয়ে উঠেছে। অমূল্য এক নীরব বিপ্লব।

রেজুয়ান হাসান, নিজস্ব প্রতিবেদক 









