
শাহ আলী তৌফিক রিপন l স্টাফ রিপোর্টার;
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কানের ভেতর আধুনিক ডিভাইস ঢুকিয়ে নকল করার ঘটনায় একাধিক প্রার্থী ধরা পড়েছে—সংবাদটি শুধু একটি পরীক্ষার অনিয়মের খবর নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নৈতিক অধঃপতনের নগ্ন প্রতিচ্ছবি। শোনা যাচ্ছে, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগও উঠেছে। অর্থাৎ যারা আগামী প্রজন্মকে নৈতিকতা শেখাবে, তারাই নৈতিকতার প্রাথমিক শর্তে ব্যর্থ!
প্রশ্ন জাগে—শিক্ষক হতে আগ্রহীরা নকল করে, প্রশ্ন ফাঁস করে চাকরি পাওয়ার কথা কীভাবে ভাবতে পারে? এই বিকৃত চিন্তার বীজ কোথায় রোপণ হয়েছে? পরিবারে, সমাজে, না কি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গভীরে?
একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নৈতিকতা, সততা ও মানবিকতার চর্চার প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু যখন শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাই অসততার মাধ্যমে পার হওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন সেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি ভেঙে পড়ে।
রাষ্ট্র বহুবার পরীক্ষায় নকল বন্ধের কথা বলেছে। প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে, নজরদারি বেড়েছে, আইন হয়েছে। তবু প্রশ্ন ফাঁস থামে না, নকল থামে না। কারণ সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়—এটি নৈতিক সংকট। আর নৈতিক সংকট প্রযুক্তি দিয়ে নয়, চরিত্র গঠনের মাধ্যমে সমাধান করতে হয়।
আমরা আজ এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে, যেখানে দুর্নীতি প্রায় স্বাভাবিক অভ্যাস, মিথ্যাচার প্রায় কৌশল, আর ভেজাল খাদ্য দৈনন্দিন বাস্তবতা। যে জাতি নিজের প্লেটে ভেজাল তুলে খায়, যে সমাজ সত্যকে চাপা দিয়ে সুবিধা খোঁজে—সে জাতির টেকসই উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সম্ভব।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই মানবিক সংস্কারের কথা ভাবে, তবে তাকে শুরু করতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক পুনর্গঠন দিয়ে। শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন প্রণয়ন, সংরক্ষণ ও পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ শিক্ষক শুধু একটি পেশা নয়—এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। আর অসততার পথে তৈরি কারিগর দিয়ে কখনো আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়া যায় না।
আজ যদি আমরা নকলকে মেনে নিই, তবে আগামী প্রজন্মও শিখবে—সততা নয়, কৌশলই সাফল্যের চাবিকাঠি। সেদিন রাষ্ট্র থাকবে, সরকার থাকবে, উন্নয়নের বিলবোর্ড থাকবে—কিন্তু সত্যিকারের মানুষ থাকবে না।
জাতির উন্নয়ন কেয়ামত পর্যন্ত থেমে যাবে—যদি আজই নৈতিকতার ভিত্তি পুনর্গঠন না করি।













